মরার পরেও গুনতে হয় টাকা

0
90

রাজধানীতে কবরস্থান ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র। গোরখোঁড়া, কবর নিরাপদ, সংরক্ষণ, কবরের মাটি ভরাটই তাদের বাণিজ্য। তারা মৃত ব্যক্তির স্বজনের কাছ থেকে নানা অজুহাতে হাতিয়ে নিচ্ছে বড় অংকের টাকা। এভাবে গোরখোদক থেকে কোটিপতি বনে গেছেন অনেকেই।

রাজধানীতে প্রায় দুই থেকে আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। কিন্তু দুই সিটিতে সরকারিভাবে কবরস্থান আছে মাত্র আটটি। উত্তর সিটিতে ছয়টি আর দক্ষিণে দু’টি। তবে সব থেকে বেশি মরদেহ দাফন করা হয় আজিমপুর কবরস্থানে।

সামাজিক দায়বদ্ধতার আড়ালে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অসাধু চক্র। পুরনো কবরই আবার নতুন করে খুঁড়ে সেখানেই দাফন করা হচ্ছে আরেকটি মরদেহ। হারিয়ে যাচ্ছে অনেকের প্রিয় বাবা-মা, ভাই-বোনসহ মৃত আত্মীয়-স্বজনের শেষ স্মৃতিটুকুও।

মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় বসবাস করেন আলিম উদ্দিন। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে ধুকে ধুকে মারা যান তিনি। কিন্তু মৃত্যুর পরও পরিবারকে গুনতে হয়েছে সেই টাকাই। স্বামীকে কবর দিতে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ৩ হাজার ৫শ’ টাকা নিয়ে স্বামীর শেষকার্য সম্পন্ন করেছেন মিরপুর কবরস্থানে। এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন মৃত আলিম উদ্দিনের স্ত্রী রোকসানা বেগম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির তত্ত্বাবধানে থাকা আটটি কবরস্থানেই দেখা মিলে একই চিত্র। কবর নিরাপদ রাখতে স্বজনদের গুনতে হয় মাসিক চাঁদা। সিটি কর্পোরেশনের আইন অনুযায়ী, কাউকে কবর দেয়ার দু’বছরের মধ্যে কবরটিতে নতুন কোনো মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা যাবে না। কিন্তু আইনের কোনো তোয়াক্কাই করে না চক্রটি।

স্বজনদের অভিযোগ, কবরের জায়গা পেতে গুনতে হয় বড় অংকের টাকা। শুধু তাই নয়, কবর সংরক্ষণ রাখতে চক্রটিকে প্রতি মাসেই দিতে হয় অন্তত ৫-৬শ’ টাকা ঘুষ। আর মাসিক চাঁদা না দিলে বছর ঘোরার আগেই ওই কবরে তৈরি হয় নতুন কবর। বাধ্য হয়ে স্বজনরা প্রতিমাসে গুনছে চাঁদার টাকা।

সরেজমিন রাজধানীর আজিমপুর, মিরপুর ও বনানী কবরস্থান ঘুরে দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশনের কবরস্থানগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের তুলনায় বহিরাগতদের সংখ্যাই বেশি। গোরখোঁড়া থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায় তাদের। সিটি কর্পোরেশন প্রতিটি কবরস্থানের জন্য ২০ থেকে ২৫ জন কর্মী নিয়োগ দিলেও সিন্ডিকেটের সদস্য রয়েছে ৮০ থেকে ১০০ জন। নগর ভবন থেকে নিয়োগ দেয়া না হলেও নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেন তারা।

আজিমপুর কবরস্থানটি রাজধানীর লালবাগ এলাকায় নতুন ও পুরনো অংশ মিলিয়ে আয়তন প্রায় ৩৭ একর। কবরস্থানটিতে কর্মরত নান্নু মিয়ার কাছে নিয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন থেকে আমাকে নিয়োগ দেয়া না হলেও আমরা প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে এখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের সহায়ককর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। কবরস্থানে তাদের প্রয়োজন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের দাফনকার্য সম্পন্ন করা হয়। ওই ২০ জন লোক দিয়ে তা সম্পাদন করা কোনোভাবেই সম্ভব না।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রায় ১৭৩ বর্গমাইল এলাকায় বাস করে দেড় কোটির বেশি মানুষ। এর অধীনে রয়েছে ছয়টি কবরস্থান। ডিএনসিসি’র হিসাবে- প্রতিদিন মারা যায় অন্তত ৫০-৬০ জন। দাফনের ফি বাবদ সর্বোচ্চ ৫শ’ টাকা নির্ধারণ করা হলেও সেখানে নেয়া হচ্ছে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৩৩ বর্গমাইল এলাকায় প্রতিদিন অন্তত ৪৫-৫০ জন মানুষের মরদেহকে কবর দেয়া হয়। পারিবারিক কবরস্থানের বাইরে এখানে রয়েছে জুরাইন ও আজিমপুর কবরস্থান। ২০১৮ সালে সেপ্টেম্বর থেকে সিটি কর্তৃক এসব কবরস্থানে লাশ দাফন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। এক কবর রক্ষণাবেক্ষেণের নামে আদায় করা হয় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা।

বনানীর বাসিন্দা কুলছুম আরা গত কয়েকদিন আগে আছর নামাজের পর বনানী কবরস্থানে বাবার কবর জিয়ারত করতে আসেন। তিনি জানান, এক বছর আগে বাবা মারা যান। এই কবরস্থানে তার বাবাকে কবর দেয়ার খরচ বাবদ গুনতে হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। কবরের চারপাশে বেড়া দিয়ে কবরটি সংরক্ষণ করতে ওই গোরখোদকদের আরো ৬ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এছাড়া কবরের মাটি ভরাট ও সাজসজ্জার জন্য দিতে হয় আরো ৫শ’ টাকা।

তিনি আরো বলেন, এগুলো ছাড়াও প্রতিমাসেই আমাকে আরো ৫ থেকে ৬শ’ টাকা করে গুনতে হয়। বাবার কবর সংরক্ষণ করতে প্রতিমাসেই তাদেরকে টাকা দেই।

বনানী ও উত্তরা কবরস্থানে সরেজমিনে দেখা যায়, কবরস্থান জিয়ারত করতে আসা বেশ কয়েকজন মানুষ গোরখোদকসহ অন্যদের (দালাল) হাতে টাকা দিয়ে কবরটা ঠিকঠাক রাখতে অনুরোধ করছেন। যারা টাকা দেয় তাদের কবরের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায়।

প্রতিবেদক পরিচয় গোপন রেখে নিকট আত্মীয়ের অগ্রিম কবরের জন্য কথা বলতে গেলে উত্তরা ৪নম্বর সেক্টর  কবরস্থানে লাশ দাফন সিন্ডিকেটের একজন বলেন, তিনি ২০ বছর ধরে মৃত ব্যক্তির দাফন কাজে নিয়োজিত। একটি কবর বেড়া দিতে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে থাকেন। এছাড়া কবর বাঁধানোর জন্য এক হাজার টাকা। কবরে গাছ-ঘাসে পানি দেয়া এবং কবর সংরক্ষণের জন্য প্রতি মাসে ৪ থেকে ৫শ’ টাকা নেন। তবে জোর করে নয় মৃত ব্যক্তির পরিবার খুশি হয়ে যা দেন তাই নেন বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন ভূঞা বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী অস্থায়ী কবর দুই বছর রাখার বিধান রয়েছে। দাফন বাবদ ৭শ’ টাকা দিতে হয় স্বজনদের। আর নিয়ম অনুযায়ী কবর সংরক্ষণ করে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা।

বাড়তি টাকা নেয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়তি টাকা নেয়ার কোনো বিধান নেই। কবরের সাজসজ্জা বাবদ এককালীন ৫ হাজার টাকা নেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনের নিয়োগকৃত কর্মী এমন কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি জানান, গোরস্থানের দাফনকৃত কবরের ওপর কোনো প্রকার বাশেঁর খুটি না দেয়ার বিষয়ে অনেক আগ থেকেই নোটিশ দেয়া হয়েছে।


একটি উত্তর ত্যাগ

দয়া করে আপনার মন্তব্য লিখুন !
দয়া করে এখানে আপনার নামটি লিখুন