নৃশংসভাবে বলি দেয়া হয় এই কুমারীকে, প্রকৃতিই তাকে করেছে মমি

0
61

দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থিত বিশাল এক পর্বতমালা আন্দিজ। বহু পার্বত্য অঞ্চল একসঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে এই পর্বতমালা গড়ে ওঠার কারণে, এখানে রয়েছে অভাবনীয় সব প্রাকৃতিক বৈচিত্র। আজ জানাবো সেই আন্দিজ পর্বতমালার লেডি অব এমপাটো ৫০০ বছর আগের এক ইনকা সুন্দরী সম্পর্কে- 

১৯৯০ সালের ঘটনা। দক্ষিণ পেরুর আন্দিজ পর্বতমালার নেভাডো স্যাবাংক্যায়া আগ্নেয়গিরি হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে। উত্তপ্ত লাভা আর ছাই ছড়িয়ে পড়তে লাগলো আশেপাশের অঞ্চলে। ফলে কাছাকাছি পর্বতচূড়া থেকে জমাট বাঁধা তুষার গলে যেতে থাকে। এদেরই একটির নাম মাউন্ট এমপাটো।

এর প্রায় পাঁচ বছর পরের কথা। ৮ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৫ সালে নৃতত্ত্ববিদ জোহান রেইনহার্ড এবং তার সহকর্মী মিগুয়েল জেরাটে পেরুর আরেকিপায় অবস্থিত মাউন্ট এমপাটোর ২০ হাজার ৬৩০ ফুট চুড়ায় উঠেন। তাদের লক্ষ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরিটাকে স্বচক্ষে অবলোকন করা। 

তারা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বরফে ঢাকা পর্বতে চূড়ার দিকে। সেই সময়ে সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় ছয় হাজার ফুট উঁচুতে অদ্ভুত কিছু দেখতে পান তারা। বরফের মধ্যে কয়েকটি উজ্জ্বল পাখির পালক। সেই পালক তাদের দৃষ্টিগোচর হলো।

নৃতত্ত্ববিদ রেইনহার্ড থমকে দাঁড়ালেন। কারণ সেগুলো আর পাঁচটি সাধারণ পাখির পালক মতো দেখতে ছিলো না। সেগুলো ছিলো মাথায় পরা মুকুটের অংশ। যা প্রাচীন ইনকাদের আনুষ্ঠানিক উৎসবের সময় মাথায় পরতো। এই মুকুট তৈরি করা হতো বিশেষ এক প্রকার পাখির পালক আর এক ধরনের ঝিনুকের খোলস দিয়ে। 

খুব তাড়াতাড়ি আরো অবশিষ্টাংশ খুঁজে পেলেন তারা। ইনকারা আশেপাশে আরো অনুসন্ধান করতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যে তারা একটি পাথরের কাঠামোর সামনে উপস্থিত হলেন। প্রফেসর রেইনহার্ড বুঝতে পারলেন, তারা প্রাচীন কোনো ইনকা মন্দির বা অনুষ্ঠান ক্ষেত্র খুঁজে পেয়েছেন।

বহু বছর ধরে যা চাঁপা পড়ে ছিলো তুষার স্তরের নিচে। তা আগ্নেয়গিরির উত্তাপে বরফ গলে উন্মুক্ত হয়েছে তাদের সামনে। অনুমান করতে পারলেন যে প্রফেসর রেইনহার্ড আরো কিছু নমুনা পাওয়া যাবে। তারা আরো খোঁজ করতে থাকেন। খুঁজতে খুঁজতে পাহাড়ের একটি খাঁজে জমাটবদ্ধ কাপড়ের একটি বান্ডিলের সন্ধান পেলেন তারা।

এরপর তারা নেমে গেলেন কাপড়ের বান্ডিল উদ্ধার করতে। কাছে যেতেই পর্বতারোহী জেরাটে চিৎকার করে উঠলেন! কারণ ততক্ষণে কাপড়ের বান্ডিলের ভেতরে থাকা একটি মৃতদেহ তার নজরে এসেছে। শীঘ্রই মৃতদেহটিকে উদ্ধার করেন তারা। 

মৃতদেহটি ছিল একটি মেয়ের। মেয়েটির গায়ের পোষাক-পরিচ্ছদ দেখে তাদের ভ্রু কুচকে গেলো। আলপাকার লোম দিয়ে তৈরি বহুমূল্য পোষাকে সজ্জিত মৃতদেহটিকে পর্যবেক্ষণ করতেই প্রফেসর রেইনহার্ড বুঝতে পারলেন। এক ইনকা কিশোরীর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। অনেকদিন আগেই মারা গিয়েছে সে। তবে কতদিন আগের তা জানা যায়নি।  

মেয়েটি মারা গিয়েছিলো আজ থেকে কমপক্ষে ৫০০ বছর পূর্বে, ১৪৪০-৮০ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে। শুধু ওই একটি মৃতদেহ নয়, সেই সঙ্গে আরো দুটি মৃতদেহ আবিষ্কৃত হলো। তিনটি দেহই অদ্ভুতভাবে সংরক্ষিত হয়ে মমিতে রুপান্তরিত হয়েছে! 

মৃতদেহের সঙ্গেই পাওয়া গেলো নানা রকম জিনিসপত্র। তার মধ্যে একটি হলো মাথায় দেয়ার বিশেষ ধরনের কাপড়ের মুকুট, যাতে রয়েছে পাখির পালকের কারুকার্য। এছাড়া পাওয়া গেলো মাটির তৈজসপত্র আর অনেক মূর্তি। 

কিসের তৈরি সেগুলো জানেন কি? নিখাদ সোনার! আছে রুপা আর কাপড়ের তৈরি মূর্তিও। তারা বুঝতে পারলেন, এভাবে উন্মুক্ত আবহাওয়ায় ফেলে রাখলে মৃতদেহগুলো সূর্যালোক এবং আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে নষ্ট হয়ে যাবে। 

আশেপাশে থাকা মূল্যবান সামগ্রীও চুরি হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া নৃতাত্ত্বিক হিসেবে এমন আকর্ষণীয় ব্যাপার আর হতে পারে না! তাই প্রত্নবস্তু সমেত মৃতদেহগুলোকে তারা পর্বতশিখর থেকে নামিয়ে নিয়ে এলেন। সেগুলোকে তারা পেরুর এরেকুইপাতে অবস্থিত দ্য ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব সান্তা মারিয়াতে শীতল রুমে রেখে দিলেন। 

প্রথম মৃতদেহকে নাম দেয়া হয় দ্য ইনকা লেডি। মাউন্ট এমপাটোতে পাওয়া যায় বলে একে দ্য লেডি অব এমপাটো কিংবা স্প্যানিশে মমি হুয়ানিতাও বলা হয়। ১৯৯৬ সালে মমিগুলোকে আমেরিকায় আনা হয়। সেখানে ইনকা লেডির উপর বিস্তারিত গবেষণা চালানো হয়। 

বিভিন্ন ধরনের ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হলো। অটোপসি বা ময়নাতদন্তের ফলে যাতে মমিটি ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। তাই কম্পিউটেড টমোগ্রাফি বা সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে গবেষকেরা জানার চেষ্টা করেন। কী রহস্য লুকিয়ে আছে এই ইনকা লেডির মধ্যে?

ভাবছেন, কি জানা গেলো এই গবেষণায়? কে ছিলো এই ইনকা লেডি? কেনই বা এমন মৃত্যু হয়েছিলো তার? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে আমাদের ঘুরে আসতে হবে ইনকা সমাজ থেকে। ইনকা দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দেয়া হয়েছিলো তাদের। 

এদের মধ্যে প্রথমে আবিষ্কৃত মেয়েটি বা ইনকা লেডির বয়স ছিলো ১২ থেকে ১৪। বাকি দু’জনের একজন ছিল ছেলে, আরেকজন মেয়ে। এদের বয়স ছিলো আনুমানিক পাঁচ আর ছয়। তবে ১৩ বছর বয়সী বালিকার দেহ অনেক অভিজাতভাবে সাজানো। অন্যদিকে বাকি দু’জন ছিলো তার তুলনায় বেশ সাদামাটা। 

বিশেষজ্ঞদের ধারণা সে ছিলো ‘স্যাক্রেড লেডি’ কিংবা ‘পবিত্র নারী’। আর বাকি দু’জন ছিলো তার সেবক কিংবা সহচর। তবে কে এই স্যাক্রেড লেডি? কেনই বা তাদের উৎসর্গ করা হয়েছিল? কি ছিল তাদের অভিপ্রায়? এর উত্তর জানতে হলে আরেকটু গভীরে যেতে হবে।

দক্ষিণ আমেরিকা যখন ইনকা সম্রাজ্য শাসন করত, তখনকার সময়ের কথা! অদ্ভুত ছিলো তাদের রীতিনীতি আর আচার আচরণ। এর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত ছিলো কাপাকোচা উৎসব। কাপাকোচা উৎসব অন্য আর পাঁচটা উৎসব থেকে ভিন্ন। এই উৎসবের জন্য চাই জীবন্ত মানুষ। তাদের যোগাড় করার ব্যবস্থাও ছিলো সারা সম্রাজ্যে বিস্তৃত।

ধারণা করা যায়, তখন ইনকা সম্রাজ্যের কোনো এক অঞ্চলে একটি পাহাড়ের উপত্যকায় থাকত মেয়েটি। মেয়েটির বাবা একজন কৃষক। জমিতে আলু আর নানা রকম ফসল ফলায়। সেগুলোই তাদের খাদ্য। মেয়েটিও মাঝে মাঝে বাবার কাছে ছুটে যেত মাঠে। কতই বা হবে বয়স? বড় জোর ১০ থেকে ১১। 

নারীসুলভ বৈশিষ্ট্য তখনও প্রকাশ পেতে শুরু করেনি তার দেহে। তবু একটি লাবণ্য ভর করেছে সারা অঙ্গে। এমন সময়ে গ্রামের পুরোহিতের চোখে পড়লো মেয়েটি। গোপনে সেই খবর পাঠালো রাজপুরোহিতকে। প্রভু, দেবতার অর্ঘ্য পাওয়া গেছে।

কয়েকদিন পরে হঠাৎ এক রাত্রে রাজার সৈন্য নিয়ে রাজপুরোহিত এসে হাজির হলো মেয়েটির বাড়ির সামনে। গম্ভীর মুখে জানালো, তাদের মেয়েকে দেবতার সেবায় উৎসর্গ করা হবে। মেয়েটিকে নিতে এসেছি। সেদিনই মেয়েটিকে শেষবার দেখেছিলো তার মা। আর কোনোদিন তার দর্শন পায়নি তার পরিবার।

ঠিক এভাবেই দেবতার চরণে বলি দেয়ার জন্য বেছে নেয়া হতো একজন কিশোর কিংবা কিশোরী। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বালিকাদের বেছে নেয়া হত। মেয়ে হলে তার কুমারী হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। প্রথমেই তাদেরকে মা-বাবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হত। 

তারপর তাদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হত। যে পরিবার থেকে কাউকে বেছে নেয়া হত, সেই পরিবারকে অনেক সম্মানের চোখে দেখা হত। আর মেয়েটি রীতিমতো দেবীর মর্যাদা পেত। তবে তা খুব দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। কারণ খুব তাড়াতাড়ি তাকে দেবতার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হত। অর্থাৎ দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হত।

এই গোটা উৎসবটাই কাপাকোচা। এখানে দেবতার উদ্দেশ্যে দান করা হতো কিশোর বাচ্চা কিংবা কুমারী নারীকে। শুধুমাত্র বড় বড় ঘটনা উদযাপন করতেই কাপাকোচা উৎসব পালন করা হতো। এর মধ্যে ছিলো সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণ, যুদ্ধ জয় কিংবা নতুন রাজপুত্রের জন্মদান। 

বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচার জন্যও তারা কাপাকোচা উৎসবের আয়োজন করত। বাছাইকৃত কিশোর বা কিশোরীকে শারীরিকভাবে খুবই নিখুঁত হতে হবে। এমনকি গায়ে কোনো তিল কিংবা আঁচড়ের দাগ থাকতে পারত না।

যতক্ষণ না চূড়ান্ত সময় আসত ততক্ষণ তার সঙ্গে রাজকীয় ব্যবহার করা হত। তাকে প্রথমেই একজন পুরোহিতের তত্ত্বাবধানে রাখা হত। সবথেকে দামি পোষাক নির্ধারিত থাকত তার জন্য। তার চুলগুলো সুগন্ধী পানিতে ধুয়ে সুন্দর করে বিনুনি করে দেয়া হত। স্বয়ং রাজা যে খাবার খেত, সেই খাবারই তাকে খাওয়ানো হত।নৃশংসভাবে বুিল দেয়া হয় তাকে

নৃশংসভাবে বুিল দেয়া হয় তাকেতারপর চূড়ান্ত উৎসবের মাস কয়েক আগে থেকে তাকে প্রচুর অ্যালকোহল আর নেশাজাতীয় দ্রব্য খাওয়ানো হত। এদের মধ্যে ছিলো কোকো পাতা, যা থেকে তৈরি হয় কোকেইন। আমাদের শরীরে থেকে বিষাক্ত পদার্থ প্রধানত বের হয়ে যায় মলমূত্রের মাধ্যমে।

সেই সঙ্গে কিছু পরিমাণ নিঃসৃত হয় ঘামের মাধ্যমে। চুল এবং নখেও জমা হয় কিছু পরিমাণ। উদাহরণস্বরুপ বলতে গেলে, ধীরে ধীরে আর্সেনিক আক্রান্ত মানুষের চুল বিশ্লেষণ করে তাতে আর্সেনিক পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানীরা মমি তিনটির দেহ থেকে প্রাপ্ত চুল বিশ্লেষণ করেন। তাতে দেখা যায়, মৃত্যুর প্রায় ২১ মাস আগে থেকে ইনকা লেডির খাদ্যে কোকেনের পরিমাণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ৬ মাস আগে সে সবচেয়ে বেশি কোকা খাবার হিসেবে গ্রহণ করেছে। 

অন্যদিকে মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পূর্বে অ্যালকোহলের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি ছিলো। কোকেইন ক্ষুধা কমিয়ে ফেলতে সাহায্য করে, রক্তনালিকে সংকুচিত করে। ফলে দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। প্রশ্বাসের বেগ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি হ্যালুসিনেশন গ্রাস করে নেয় ওই ব্যক্তিকে। ফলে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি লোপ পেত তার। নিজের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা ছিল না তার।  

ধীরে ধীরে সময় যত ঘনিয়ে আসত। ওদিকে মদ এবং নেশা বস্তুর পরিমাণও আরও বাড়ত। ফলে সারাক্ষণ নেশাগ্রস্থ হয়ে থাকত তারা। উৎসবের দিন সবাই মিলে নাচ, গান, হৈ-হুল্লোড় করতে করতে মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হত বহু দূরের এক পবিত্র পাহাড় চূড়ায়।

সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর সমস্ত দিন নানা পর্ব পালন করে দিনের শেষে ফিরে আসত তারা। তবে মেয়েটিকে রেখে আসত পাহাড় চূড়ায় একটি ছোট কুঠিরে। তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করার জন্য মাথায় ভারি কিছু দিয়ে আঘাতও করত। দ্য মেইডেন লেডি অব ইনকা কিংবা ইনকা কুমারী ছিলো এমনই এক হতভাগা! 

প্রকৃতির এক বিচিত্র খেয়ালে তার দেহ মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে চাপা পড়ে গিয়েছিলো বরফের তলায়। কিংবা কে জানে? হয়তো জীবন্ত সমাধিই হয়েছিলো তার। তবে ১৯৯৯ সালে আবার ইনকা কুমারী আমাদের মাঝে ফিরে এলো। ততদিনে ৫০০ বছর কেটে গেছে পৃথিবীতে। যে সম্রাট নিজ সমৃদ্ধির আশায় নিষ্ঠুর দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দিয়েছিলো একটি নিষ্পাপ প্রাণ, তিনিও হারিয়ে গেছে মহাকালের গর্ভে।